দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেরিকোর উপকণ্ঠে ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বসতিস্থাপনকারীদের সহযোগিতা ও আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটানোর অভিযোগ উঠেছে।
জেরিকোর দক্ষিণ-পশ্চিমে আইন আল-দুইউক এলাকায় একসময় বাড়ি, বাগান ও সুইমিংপুল থাকা জায়গাগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মাটির নিচে চাপা পড়েছে পুরো বাড়ি। কোথাও কেবল বিচ্ছিন্ন পানির পাইপ ও ধ্বংসাবশেষ দেখে বোঝা যায়, সেখানে মানুষের বসতি ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ১৯ জুলাই থেকে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী হানান হার্বস্টের নেতৃত্বে খননযন্ত্র দিয়ে নিয়মিতভাবে এলাকার বাড়িঘর, দেয়াল, বাগান ও গাছপালা ধ্বংস করা হচ্ছে। প্রতিবারই তার সঙ্গে ইসরায়েলি সেনারা থাকছেন। তবে বাসিন্দাদের কোনো আনুষ্ঠানিক উচ্ছেদ বা ধ্বংসের আদেশ দেখানো হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সালাহ বলেন, তার বাড়ির প্রবেশপথের সামনে ধ্বংসস্তূপ ফেলে রাখায় এখন তাকে বেড়া টপকে বাড়িতে ঢুকতে হয়। বসতিস্থাপনকারীকে বিষয়টি জানালে তিনি নাকি বলেন, কীভাবে বাড়িতে ঢুকবেন, সেটা তার সমস্যা নয়।
এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ওই এলাকায় বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় কয়েকটি বাড়ি ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখোশধারী কয়েক ডজন বসতিস্থাপনকারী প্রায় আট ঘণ্টা ধরে এলাকায় হামলা চালায়। এতে ১৩টি বেদুইন পরিবারের বাড়ি ধ্বংস করা হয়। পাশের ফিলিস্তিনি বসতিতে আরও তিনটি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়।
হামলার পর কয়েক মাস পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও বসতিস্থাপনকারীরা স্থানীয়দের সম্পত্তি নিয়ে যাওয়া, গাছ উপড়ে ফেলা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি মেরামতে বাধা দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর জুলাইয়ের মাঝামাঝি আবার ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীরা পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে যোগাযোগ করলেও শুরুতে কেউ এ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কিছু জানে না বলে জানানো হয়। পরে সামরিক বাহিনীর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজের অনুমতি দিয়েছেন বলে জানানো হয়।
ইসরায়েলের হাইকোর্টে দায়ের করা মামলায় দেশটির রাষ্ট্রপক্ষের নথিতেও ওই এলাকায় বসতিস্থাপনকারী হার্বস্টের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থার সেটেলমেন্ট বিভাগের সঙ্গে হার্বস্টের একটি চুক্তি হয়। ওই চুক্তির আওতায় তাকে তথাকথিত রাষ্ট্রীয় জমিতে কৃষিকাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
ফেব্রুয়ারির হামলার পর বিনিয়ামিন আঞ্চলিক পরিষদ ওই এলাকায় পড়ে থাকা নির্মাণসামগ্রীর ধ্বংসাবশেষ সরানোর অনুমতি চায়। পরে সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সেই অনুমতি দেয় এবং জর্ডান ভ্যালি ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল গিলাদ শ্রিকি হার্বস্টকে সামরিক নিরাপত্তা দেওয়ার অনুমোদন দেন।
তবে আইনজীবী তাওফিক জাবারিনের অভিযোগ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী সরাসরি বাড়ি না ভেঙে বসতিস্থাপনকারীকে দিয়ে সেই কাজ করাচ্ছে। তার দাবি, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কার্যত বসতিস্থাপনকারীদের স্বার্থে কাজ করছে এবং আদালতের আদেশকে পাশ কাটানো হচ্ছে।
জাবারিন বলেন, বসতিস্থাপনকারী ভবন ও গাছপালা ধ্বংস করে চলেছেন, যদিও জেরুজালেমের একটি আদালতের নিষেধাজ্ঞায় ওই স্থাপনা ধ্বংসে সেনাবাহিনীকে বাধা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে আল জাজিরার পক্ষ থেকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। হার্বস্টের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি আল জাজিরার পরিচয় জানার পর ফোন কেটে দেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধ্বংস করা জমিতে বসতিস্থাপনকারী হার্বস্ট কৃষিকাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, জমিটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এবং কৃষিকাজের জন্য হার্বস্টকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় অধিকারকর্মীদের ভাষ্য, ওই বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট মানচিত্র বা সীমানা কখনো প্রকাশ করা হয়নি।
নিজের বাড়িতে ফিরতে না পারা সালাহ বর্তমানে স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে বেথলেহেমে ভাড়া বাসায় থাকছেন। মাসে ২ হাজার শেকেল ভাড়া দিতে হলেও সেখানে তার কাজ নেই।
নিজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সালাহ বলেন, সন্তানরা তাকে বারবার জিজ্ঞেস করে তারা কেন নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছে না। কিন্তু তাদের প্রশ্নের কোনো উত্তর তার কাছে নেই।
সূত্র: আল জাজিরা
এমএস/